স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী, স্বায়ত্তশাসিত ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলাই স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন গঠনের মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মজবুত ও গণতান্ত্রিক সংগঠন কাঠামো সৃষ্টি, সহজ ও স্বচ্ছ আইন কাঠামো রচনা, অর্থায়ন ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণ, সঠিক সুশাসনের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়সহ এর অধীন নানা দপ্তর-অধিদপ্তরের পুনর্গঠন, জাতীয়ভাবে বিকেন্দ্রীকরণকে উৎসাহিত ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, বেসরকারি উদ্যোগে ও কমিউনিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সর্বস্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবিড় সম্পর্ক সৃষ্টি ইত্যাদিকে বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের করণীয় হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিধি তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ কমিশনের কাজ কেবল সুপারিশ প্রণয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সুপারিশগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তারও একটি বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করেছে এ কমিশন। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, স্থানীয় শাসন ও উন্নয়নের একটি নবতর ধারা সৃষ্টিই ছিল এ কমিশনের মূল লক্ষ্য।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুসারে, ইউনিয়ন পরিষদগুলো বার্ষিক ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করবে। সে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ২০১৩ সালে জারি করা ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন পরিকল্পনা বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে। পরিকল্পনা ও বাজেটের পারস্পরিক সম্পর্ক থাকবে। প্রথম পরিকল্পনায় ব্যয়ের খাত নির্দিষ্ট হওয়ার পর বাজেটে তা অন্তর্ভুক্ত হবে। স্থায়ী কমিটিগুলো প্রতিটি পরিকল্পনার অঙ্গ বা উপাদান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করবে। সবার সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি পৃথক পৃথক খসড়া তৈরি করে একটি পরিকল্পনা সম্মেলনের আয়োজন করবে। ওই আলোচনার পর পূর্ণাঙ্গ পরিষদ পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করবে। পরিকল্পনা অনুমোদনের পর একই প্রক্রিয়ায় বাজেট অনুমোদিত হবে। পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনা ও বাজেটের বাইরে কোনো ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। ইউনিয়ন পরিষদের কোনো সদস্য বা কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোনো প্রকল্পের ঠিকাদার, সরবরাহকারীসহ কোনো লাভজনক কাজ করতে পারবে না।
ইউনিয়ন পরিষদ একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বার্ষিক পরিকল্পনা বই প্রণয়ন করবে। সে বইয়ে ‘শিক্ষা পরিকল্পনা’ নামে একটি অধ্যায় থাকবে। শিক্ষাবিষয়ক স্থায়ী কমিটি এ পরিকল্পনার খসড়া প্রণয়ন করবে ও শিক্ষার সব অংশীজন পরিকল্পনার খসড়া প্রণয়নে অংশগ্রহণ করবে। স্কুল-মাদ্রাসা নির্বিশেষে সব বিদ্যায়তনের প্রধান শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটি নিজ নিজ বিদ্যায়তনের পরিকল্পনা করবেন ও পরিষদে জমা দেবেন। পরিকল্পনার সময়ে শিক্ষক-অভিভাবক সমন্বয় কমিটির সঙ্গে সভা করে মতামত গ্রহণ করবেন। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ইউনিয়ন পরিষদের শিক্ষাবিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে এ শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে সহায়তা করবেন। পরিকল্পনার শুরুতে স্কুল/মাদ্রাসা/সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ও শিক্ষক সংখ্যা, গত বছরের সর্বশেষ ক্লাসের ফলাফল, সহশিক্ষা কার্যক্রম প্রভৃতির একটি বর্ণনা থাকবে। আগামীতে শিক্ষার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিভিন্ন শিক্ষাসহায়ক সরঞ্জামের প্রয়োজন নিরূপণ এবং অর্থ-সম্পদের সংস্থান কীভাবে হতে পারে তার একটি রূপরেখা থাকবে। চেয়ারম্যান কাউন্সিলের সদস্য, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সময়ে সময়ে যৌথভাবে স্কুল পরিদর্শন করবেন। এলাকায় কর্মরত এনজিওগুলোকে শিক্ষাবিষয়ক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে।
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের অবস্থা বিশ্লেষণসহ সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিষদের একটি একদিনের কর্মশালা আয়োজন করে জনগণের প্রত্যাশা এবং সেবার ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে কীভাবে সেবা-সরবরাহে ব্যাপকতা ও গভীরতা বৃদ্ধি করা যায় এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি হবে। এ প্রতিবেদন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে প্রেরিত হবে। পরবর্তী সময়ে উপজেলা পরিষদে বিষয়টি আলোচনা করে করণীয় নির্ধারিত হবে। ইউনিয়নের নিজস্ব একটি স্বাস্থ্য পরিকল্পনা করা হবে। এটি সব সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে।
সরকার বিচার বিবেচনা করে যদি অকার্যকর, ব্যয়বহুল ও ব্যবস্থাপনা জটিলতার আশঙ্কা দেখে তাহলে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ইউনিয়ন একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়ন হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এ ইউনিয়ন হাসপাতালে একজন মহিলাসহ অবিলম্বে তিনজন চিকিৎসকের সঙ্গে সহায়ক নার্স, প্যারামেডিক, হেলথ টেকনোলজিষ্ট ও সহায়ক কর্মীর বন্দোবস্ত থাকবে। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় বা কোনো জাতীয় এনজিও যদি কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহী হয় সেটি বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ‘স্বেচ্ছাসেবী মেডিকেল সোশ্যাল ওয়ার্ক’ ইউনিট বা সমিতি থাকবে। এ সমিতি বা ইউনিটের জনগণের চাঁদায় একটি তহবিল গঠিত হবে। এ তহবিল স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নানা প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করবে। ইউনিয়ন পরিষদের সার্বিক পরিকল্পনার অধীনে একটি স্বাস্থ্য, পরিবার কল্যাণ, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু কল্যাণ ও পুষ্টি পরিকল্পনা থাকবে। এ পরিকল্পনার অধীনে ইউনিয়ন পরিষদ স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোয় স্বাস্থ্য শিক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
ব্যক্তি ও সমষ্টি উদ্যোগে নতুন বাজার সৃষ্টি করা যাবে। মহাসড়ক বা চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এমন কোনো বাজার বসানো যাবে না। সড়ক-মহাসড়ক থেকে দূরে কোনো উন্মুক্ত স্থানে সাপ্তাহিক কাঁচা বাজার চালু করা যাবে। বাজারের ইজারা ও আয়-ব্যয় মূল্যায়ন করে ইজারামূল্য নির্ধারণ হবে। ব্যক্তিগত জমিতে বাজার বসলে জমির মালিক ইজারামূল্যের অংশ পাবে। বাজারে মলমূত্র ত্যাগের জন্য যথাযথ ল্যাট্রিন স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। হাটবাজার কমিটির কার্যপরিধি, মাসিক চাঁদা ও নিয়মিত টোল নির্ধারণ ও সংগ্রহ স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে হবে। বাজারের আইন-শৃঙ্খলা, অপরাধ, মাদক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কাজ কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী সব কর্মকাণ্ডে নানা কমিউনিটি সংগঠন ও আগ্রহী এনজিওগুলোর যুক্ত করার বিধান করতে হবে।
মসজিদসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কমিটিগুলো সঠিকভাবে গঠন করা। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ আয় ও ব্যয়, নিরীক্ষা ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের সুরক্ষা প্রদান। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক (স্বধর্মাবলম্বীদের জন্য) সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা। যেমন মসজিদে একটি দরিদ্র তহবিল করে সেখানে জাকাত, ফিতরা, সদকা প্রভৃতি গ্রহণ করে দরিদ্র পুনর্বাসন করতে পারে। মসজিদে বয়স্কদের কোরআন হাদিস শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে পারে। শিশু, কিশোর ও যুবকদের জন্য নৈতিক শিক্ষার নানা আয়োজন করতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়ও তাদের ধীরে ধীরে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। ইমাম-মোয়াজ্জিনের জন্য উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করতে পারে। এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় মসজিদগুলো অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহায়তা করতে পারে। উগ্র ধর্মীয় মতামত প্রচারের মাধ্যমে বা বিভিন্ন পীর, দরবার ও ফেরকাকেন্দ্রিক সংঘাত যাতে না হয় সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও জাতিগতভাবে ভিন্ন সত্তার অধিকারী নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় মসজিদগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
এসব কাজে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটি এলাকায় কার্যরত এনজিওদের সভায় আহ্বান করতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক পরিকল্পনার সময়ে তাদের কার্যক্রমগুলো পৃথকভাবে দেখাতে পারে। যেখানে সম্ভব সেখানে আর্থিক সামাজিক সহায়তা দিয়ে কার্যক্রমগুলো যাতে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় সেজন্য তাদের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের একটি কর্মসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তবে কারো কাজে অনর্থক হস্তক্ষেপ নয়, সহযোগিতার ক্ষেত্র বৃদ্ধিই মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয়ভাবে নারী-পুরুষের নানা দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ দানে এনজিওগুলো ভালো ভূমিকা পালন করতে পারে। কোনো সামাজিক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এনজিও কর্মী ও দলীয় সদস্যদের প্রতিরোধ-প্রতিবাদ করা থেকে বিরত রাখা যাবে না। এলাকায় সমবায় সমিতিগুলোর সঙ্গে ও ইউনিয়ন পরিষদ একটি সম্পর্ক গড়ে তুলবে। ঋণ সমবায়, কৃষি ও সেচ সমবায়, বিপণন ও ভোক্তা সমবায় প্রসারে সর্বোত্তমভাবে সহায়তা প্রদান করবে। আমার বিশ্বাস, অন্তর্বর্তী সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো ইউনিয়ন পরিষদের পরিকল্পনা ক্ষেত্র এবং কার্যাবলি পুনর্বিবেচনার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে একসঙ্গে কাজ করার এটাই সর্বোত্তম সময়, যাতে জনকল্যাণে বিশ্বাসযোগ্য পরিবর্তন আনা যায়।
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং প্রফেসর, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও হার্ভার্ড সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ২০২৪